পৃথিবীতে কীভাবে প্রথম প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল, তা বিজ্ঞানজগতের অন্যতম বড় একটি রহস্য। আজ থেকে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে সৃষ্ট পৃথিবী ছিল চরম উত্তপ্ত এবং মুক্ত অক্সিজেনবিহীন একটি গ্রহ। কিন্তু এই রুক্ষ পরিবেশেই লুকিয়ে ছিল জীবনের বীজ। জড় পদার্থ থেকে কীভাবে ধাপে ধাপে জীবন্ত কোষের সৃষ্টি হলো, তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয় রাসায়নিক বিবর্তন তত্ত্ব (Chemical Evolution)। আর এই বিবর্তনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো কোয়াসারভেট (Coacervate) গঠন।
১৯২৪ সালে রাশিয়ান বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওপারিন এবং ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জে.বি.এস. হ্যালডেন স্বাধীনভাবে প্রস্তাব করেন যে, আদিম পৃথিবীর মহাসাগরে থাকা বিভিন্ন অজৈব গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ বজ্রপাত ও অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে বিক্রিয়া করে জৈব অণুতে পরিণত হয়। এই জৈব অণুগুলো একত্রিত হয়ে যে আদিম কলয়েডাল বিন্দুর সৃষ্টি করে, বিজ্ঞানী ওপারিন তার নাম দেন কোয়াসারভেট। এটি ল্যাটিন শব্দ 'coacervare' থেকে এসেছে, যার অর্থ গুচ্ছবদ্ধ হওয়া বা একত্রিত হওয়া।
প্রাণের উৎপত্তির ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো। বাটনগুলোতে ক্লিক করে বিস্তারিত জেনে নিন:
আদিম গ্যাসীয় পরিবেশ: আদিম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেন (O₂) ছিল না। সেখানে প্রচুর পরিমাণে মিথেন (CH₄), অ্যামোনিয়া (NH₃), হাইড্রোজেন (H₂) এবং জলীয় বাষ্প (H₂O) বিদ্যমান ছিল। এটি ছিল একটি 'বিজারক' (Reducing) পরিবেশ, যা জৈব অণু তৈরির জন্য আদর্শ।
সরল জৈব অণু সৃষ্টি: বজ্রপাত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি শক্তির জোগান দেয়। ফলে গ্যাসগুলো বিক্রিয়া করে অ্যামিনো এসিড, শর্করা, ফ্যাটি এসিড এবং পিউরিন ও পাইরিমিডিন এর মতো জীবনের প্রাথমিক উপাদান বা মোনোমার তৈরি করে।
তপ্ত লঘু স্যুপ (Hot Dilute Soup): বৃষ্টির সাথে এই অণুগুলো আদিম মহাসাগরে এসে পড়ে। উত্তপ্ত পানিতে এরা একত্রিত হয়ে প্রোটিন ও নিউক্লিক এসিডের মতো পলিমার তৈরি করে। বিজ্ঞানী হ্যালডেন এই পুষ্টিসমৃদ্ধ মহাসাগরীয় জলভাগকে 'হট ডাইলিউট স্যুপ' বলে আখ্যায়িত করেন।
কোয়াসারভেট গঠন: পলিমারগুলো (বিশেষ করে প্রোটিন ও লিপিড) পানির অণুকে সাথে নিয়ে একটি আবরণ তৈরি করে এবং কলয়েড কণা হিসেবে পানিতে ভাসতে থাকে। এটিই হলো কোয়াসারভেট, যা চারপাশের পরিবেশ থেকে রাসায়নিক পদার্থ শোষণ করে আকারে বড় হতে পারতো।
প্রোটোবায়োন্ট (আদি কোষ): যখন কোয়াসারভেটের ভেতরে নিউক্লিক এসিড (যেমন- RNA) প্রবেশ করে এবং এটি নিজে থেকে বিভাজিত হওয়ার (Self-replication) ক্ষমতা লাভ করে, তখন তাকে প্রোটোবায়োন্ট বা পৃথিবীর প্রথম আদি কোষ বলা হয়।
কোয়াসারভেটের গঠন কেমন ছিল? নিচের বৃত্তের বাইরের ড্যাশ লাইনে এবং ভেতরের কেন্দ্রে ক্লিক করে এর গঠন সম্পর্কে জানুন।
বামে থাকা বৃত্তের বিভিন্ন অংশে ক্লিক করুন।
বিজ্ঞানী ওপারিন যেমন 'কোয়াসারভেট' তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তেমনি বিজ্ঞানী সিডনি ফক্স (Sydney Fox) আদি কোষের অন্য একটি মডেল প্রস্তাব করেন, যার নাম মাইক্রোস্ফিয়ার (Microsphere)। নিচের অংশগুলোতে ক্লিক করে এদের পার্থক্য জানুন:
কোয়াসারভেট মূলত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং লিপিডের একটি মিশ্রণ। এর চারপাশে পানির অণু বা লিপিডের একটি সুনির্দিষ্ট দ্বি-স্তরীয় আবরণ থাকে।
মাইক্রোস্ফিয়ার প্রধানত 'প্রোটিনয়েড' (তাপের প্রভাবে অ্যামিনো এসিড যুক্ত হয়ে তৈরি হওয়া পলিমার) দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানী ফক্স প্রমাণ করেন যে এরা ব্যাকটেরিয়ার মতো দ্বি-বিভাজন প্রক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
১৯৫৩ সালে স্ট্যানলি মিলার এবং হ্যারল্ড উরে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে আদিম পৃথিবীর পরিবেশ (মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন ও পানি এবং বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ) তৈরি করেন। কিছুদিন পর তারা দেখেন সেখানে অ্যামিনো এসিড তৈরি হয়েছে! এটি প্রমাণ করে যে, রাসায়নিক বিবর্তন আসলেই সম্ভব ছিল।
নিচের বাটনগুলো ক্রমান্বয়ে চেপে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে আদিম কোষ তৈরি করুন!
বাম পাশের বিজ্ঞানীর নামের সাথে ডান পাশের তাদের আবিষ্কারের সঠিক জোড়া মেলান। প্রথমে একটিতে ক্লিক করুন, তারপর অন্যটিতে।
১. রাসায়নিক বিবর্তনের জন্য আদিম পৃথিবীতে কোন গ্যাসটি অনুপস্থিত ছিল?
