ক্লাস 9 জীবন বিজ্ঞান: পুষ্টি notes

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ - নবম শ্রেণি - জীবনবিজ্ঞান: পুষ্টি (Nutrition) সম্পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, Bigyanbook-এ তোমাদের স্বাগত। আজকের এই পোস্টে আমরা পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণির জীবনবিজ্ঞান সিলেবাসের 'জৈবনিক প্রক্রিয়া' অধ্যায় থেকে 'পুষ্টি (Nutrition)' অংশটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। উদ্ভিদ ও প্রাণী পুষ্টির প্রকারভেদ, বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ লবণের অভাবজনিত রোগ এবং মানুষের পরিপাকতন্ত্র থেকে যত রকমের প্রশ্ন পরীক্ষায় আসতে পারে, তার সবকিছুই এই প্রিমিয়াম নোটসে গুছিয়ে দেওয়া হয়েছে। চলো শুরু করা যাক!


বিভাগ ক: অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. পুষ্টি বা Nutrition কাকে বলে?
উত্তর: যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় জীব খাদ্য গ্রহণ, পরিপাক, শোষণ, আত্তীকরণ ও বহিষ্করণের মাধ্যমে দেহের বৃদ্ধি ঘটায়, ক্ষয়পূরণ করে এবং কাজ করার প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন করে, তাকে পুষ্টি বলে।

২. উদ্ভিদের পুষ্টি প্রধানত কয় প্রকার ও কী কী?
উত্তর: উদ্ভিদের পুষ্টি প্রধানত দুই প্রকার: ১. স্বভোজী পুষ্টি (Autotrophic) এবং ২. পরভোজী পুষ্টি (Heterotrophic)।

৩. একটি সম্পূর্ণ পরজীবী ও একটি আংশিক পরজীবী উদ্ভিদের নাম লেখো।
উত্তর: সম্পূর্ণ পরজীবী উদ্ভিদ হলো— স্বর্ণলতা। আংশিক পরজীবী উদ্ভিদ হলো— চন্দন।

৪. দুটি পতঙ্গভুক উদ্ভিদের (Insectivorous plant) নাম লেখো।
উত্তর: কলসপত্রী (Pitcher plant) এবং সূর্যশিশির (Sundew)।

৫. একটি মিথোজীবী উদ্ভিদের (Symbiotic plant) উদাহরণ দাও।
উত্তর: লাইকেন (Lichen) হলো শৈবাল ও ছত্রাকের সমন্বয়ে গঠিত একটি মিথোজীবী উদ্ভিদ।

৬. প্রাণী পুষ্টি বা হলোজোয়িক পুষ্টির পর্যায়গুলি কী কী?
উত্তর: প্রাণী পুষ্টির পাঁচটি পর্যায় হলো: খাদ্যগ্রহণ, পরিপাক, শোষণ, আত্তীকরণ এবং বহিষ্করণ।

৭. জলে দ্রবণীয় দুটি ভিটামিনের নাম লেখো।
উত্তর: জলে বা তরলে দ্রবণীয় দুটি ভিটামিন হলো— ভিটামিন B-কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন C।

৮. ফ্যাটে বা স্নেহপদার্থে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলি কী কী?
উত্তর: ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলি হলো— ভিটামিন A, D, E এবং K।

৯. রাতকানা রোগ কোন ভিটামিনের অভাবে হয়?
উত্তর: ভিটামিন A-এর অভাবে রাতকানা (Night blindness) রোগ হয়।

১০. স্কার্ভি (Scurvy) রোগ কোন ভিটামিনের অভাবে হয়?
উত্তর: ভিটামিন C-এর অভাবে স্কার্ভি (মাড়ি থেকে রক্ত পড়া) রোগ হয়।

১১. একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের BMR (Basal Metabolic Rate) কত?
উত্তর: একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক BMR হলো প্রায় ৪০ কিলোক্যালরি/বর্গমিটার দেহতল/ঘণ্টা।

১২. প্রোটিন ও ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের তাপন মূল্য (Calorific value) কত?
উত্তর: প্রোটিনের তাপন মূল্য ৪.১ Kcal/gm এবং ফ্যাটের তাপন মূল্য ৯.৩ Kcal/gm।


বিভাগ খ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ২)

১. স্বভোজী ও পরভোজী পুষ্টির মধ্যে পার্থক্য লেখো।
উত্তর:

  • স্বভোজী পুষ্টি: যে পুষ্টি প্রক্রিয়ায় জীব নিজের খাদ্য নিজেই সংশ্লেষ করতে পারে এবং পুষ্টির জন্য অন্য কোনো জীবের ওপর নির্ভর করে না, তাকে স্বভোজী পুষ্টি বলে। (যেমন- সবুজ উদ্ভিদ)।
  • পরভোজী পুষ্টি: যে পুষ্টি প্রক্রিয়ায় জীব নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না, পুষ্টির জন্য অন্য উদ্ভিদ বা প্রাণীর ওপর নির্ভর করে, তাকে পরভোজী পুষ্টি বলে। (যেমন- মানুষ, স্বর্ণলতা, ছত্রাক)।

২. স্যাঙ্গুইনিভোর (Sanguivore) এবং কপ্রোফ্যাগি (Coprophagy) কাকে বলে?
উত্তর:

  • স্যাঙ্গুইনিভোর (রক্তচোষা): যে সব প্রাণী অন্য প্রাণীর রক্ত পান করে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাদের স্যাঙ্গুইনিভোর বলে। যেমন- মশা, জোঁক।
  • কপ্রোফ্যাগি (মলভোজী): যে সব প্রাণী নিজেদের বা অন্য প্রাণীর মল ভক্ষণ করে পুষ্টি সম্পন্ন করে, তাদের কপ্রোফ্যাগি বলে। যেমন- গুবরে পোকা, গিনিপিগ।

৩. রাফেজ (Roughage) বা তন্তু জাতীয় খাদ্যের গুরুত্ব কী?
উত্তর: রাফেজ হলো খাদ্যের সেই অংশ যা পরিপাক হয় না (যেমন- সেলুলোজ)। এর গুরুত্ব হলো:

  • এটি মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং মলত্যাগে সাহায্য করে, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।
  • অন্ত্রের ক্যানসার প্রতিরোধে এবং রক্তে কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

৪. সুষম খাদ্য (Balanced Diet) কাকে বলে?
উত্তর: যে খাদ্যে খাদ্যের ছয়টি উপাদান (শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও জল) নির্দিষ্ট ও সঠিক অনুপাতে উপস্থিত থাকে এবং যা গ্রহণ করলে দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ ও প্রয়োজনীয় শক্তির চাহিদা সম্পূর্ণ মেটে, তাকে সুষম খাদ্য বলে। (মায়ের দুধকে শিশুদের জন্য আদর্শ সুষম খাদ্য ধরা হয়)।

৫. আত্তীকরণ (Assimilation) বলতে কী বোঝো?
উত্তর: পরিপাকের পর সরল ও তরল খাদ্যরস অন্ত্র থেকে শোষিত হয়ে রক্তে মেশে। এরপর সেই শোষিত খাদ্যরস দেহকোষের প্রোটোপ্লাজমের অংশে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে আত্তীকরণ বা Assimilation বলে।


বিভাগ গ: রচনাধর্মী / দীর্ঘ প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৩ / ৫)

১. উদ্ভিদের পরভোজী পুষ্টির প্রকারভেদগুলি উদাহরণসহ আলোচনা করো।
উত্তর: উদ্ভিদের পরভোজী পুষ্টি প্রধানত চার প্রকারের হয়:

  1. পরজীবী পুষ্টি (Parasitic): যে পুষ্টি প্রক্রিয়ায় কোনো উদ্ভিদ অন্য কোনো সজীব আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের দেহ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে বেঁচে থাকে এবং আশ্রয়দাতার ক্ষতি করে, তাকে পরজীবী পুষ্টি বলে। যেমন- স্বর্ণলতা (সম্পূর্ণ পরজীবী), চন্দন (আংশিক পরজীবী)।
  2. মৃতজীবী পুষ্টি (Saprophytic): যে পুষ্টি প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ গলিত ও পচা মৃত জীবদেহ বা জৈব পদার্থ থেকে পুষ্টিরস শোষণ করে, তাকে মৃতজীবী পুষ্টি বলে। যেমন- মিউকর, অ্যাগারিকাস (ব্যাঙের ছাতা), মনোট্রপা।
  3. মিথোজীবী পুষ্টি (Symbiotic): যে পুষ্টি প্রক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন প্রজাতির জীব একে অপরের সাহায্যে সহাবস্থান করে এবং উভয়েই উপকৃত হয়, তাকে মিথোজীবী পুষ্টি বলে। যেমন- লাইকেন (শৈবাল ও ছত্রাকের সহাবস্থান)।
  4. পতঙ্গভুক পুষ্টি (Insectivorous): যে সব উদ্ভিদ নাইট্রোজেন ঘটিত খাদ্যের অভাব মেটানোর জন্য বিশেষ ফাঁদের সাহায্যে পতঙ্গ ধরে এবং তাদের দেহ থেকে প্রোটিন বা পুষ্টিরস শোষণ করে, তাদের পতঙ্গভুক উদ্ভিদ বলে। যেমন- কলসপত্রী, সূর্যশিশির, পাতাঝাঁঝি।

২. মানবদেহে প্রোটিন ও ফ্যাট পরিপাককারী উৎসেচকগুলির নাম ও কাজ লেখো।
উত্তর: মানুষের পরিপাকতন্ত্রে প্রোটিন ও ফ্যাট পরিপাককারী প্রধান উৎসেচকগুলির কাজ নিচে দেওয়া হলো:
প্রোটিন পরিপাককারী উৎসেচক:

  • পেপসিন (Pepsin): পাকস্থলীতে উৎপন্ন হয়। এটি জটিল প্রোটিনকে ভেঙে পেপটোন ও প্রোটিওজ-এ পরিণত করে।
  • ট্রিপসিন (Trypsin): অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হয়। এটি পেপটোনকে ভেঙে পেপটাইড ও অ্যামাইনো অ্যাসিড তৈরি করে।
  • ইরেপসিন (Erepsin): আন্ত্রিক রসে থাকে। এটি পেপটাইডকে ভেঙে সম্পূর্ণভাবে অ্যামাইনো অ্যাসিডে পরিণত করে।
ফ্যাট বা স্নেহপদার্থ পরিপাককারী উৎসেচক:
  • লাইপেজ (Lipase): মূলত অগ্ন্যাশয় ও আন্ত্রিক রসে থাকে। এটি ফ্যাটকে বিশ্লিষ্ট করে ফ্যাটি অ্যাসিড এবং গ্লিসারল-এ পরিণত করে। (পিত্তরস ফ্যাটকে ছোট ছোট কণায় ভাঙতে বা ইমালসিফিকেশন করতে সাহায্য করে, যাতে লাইপেজ সহজে কাজ করতে পারে)।

৩. মানবদেহে ভিটামিন A, D, C এবং K-এর উৎস ও অভাবজনিত রোগগুলি ছকের সাহায্যে বা পর্যায়ক্রমে লেখো।
উত্তর:

  • ভিটামিন A (রেটিনল):
    উৎস: গাজর, পাকা আম, টমেটো, দুধ, মাখন, কড ও হ্যালিবাট মাছের যকৃতের তেল。
    অভাবজনিত রোগ: রাতকানা (Night blindness), জেরপথ্যালমিয়া (চোখের কর্নিয়া শুকিয়ে যাওয়া), ফিনোডার্মা বা টোড স্কিন (ত্বক ব্যাঙের চামড়ার মতো খসখসে হয়ে যাওয়া)।
  • ভিটামিন D (ক্যালসিফেরল):
    উৎস: কড ও হ্যালিবাট মাছের যকৃতের তেল, দুধ, ডিমের কুসুম, সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি (ত্বকে সংশ্লেষিত হয়)।
    অভাবজনিত রোগ: শিশুদের রিকেট (Rickets - হাড় বেঁকে যাওয়া) এবং বয়স্কদের অস্টিওম্যালাসিয়া রোগ হয়।
  • ভিটামিন C (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড):
    উৎস: আমলকী, লেবু, পেয়ারা, কাঁচালঙ্কা, টমেটো, অঙ্কুরিত ছোলা।
    অভাবজনিত রোগ: স্কার্ভি (মাড়ি ফুলে যাওয়া এবং রক্ত পড়া), দাঁতের গোড়া আলগা হয়ে যাওয়া।
  • ভিটামিন K (ফাইলোকুইনোন):
    উৎস: বাঁধাকপি, পালংশাক, টমেটো, সয়াবিন। (মানুষের অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ারাও এটি সংশ্লেষ করে)।
    অভাবজনিত রোগ: রক্ত তঞ্চন ব্যাহত হয় (রক্ত জমাট বাঁধতে দেরি হয়), ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা হেমারেজ দেখা দেয়।

৪. মানবদেহে ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং আয়োডিনের ভূমিকা ও অভাবজনিত লক্ষণ লেখো।
উত্তর: মানবদেহের সুস্থতার জন্য খনিজ লবণের ভূমিকা অপরিসীম।

  • ক্যালসিয়াম (Ca):
    ভূমিকা: অস্থি ও দাঁতের গঠন মজবুত করে এবং রক্ত তঞ্চনে সাহায্য করে।
    অভাবজনিত লক্ষণ: দাঁত ও হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়, শিশুদের রিকেট ও বয়স্কদের অস্টিওম্যালাসিয়া হতে পারে। পেশিতে টান (টিটেনি) দেখা দেয়।
  • আয়রন বা লৌহ (Fe):
    ভূমিকা: রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
    অভাবজনিত লক্ষণ: রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া (Anemia) রোগ হয়। দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দেয়।
  • আয়োডিন (I):
    ভূমিকা: থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে এবং মানসিক বিকাশে সাহায্য করে।
    অভাবজনিত লক্ষণ: গলগণ্ড বা গয়টার (Goitre - গলা ফুলে যাওয়া) রোগ হয়। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।


আশা করি Bigyanbook-এর এই প্রিমিয়াম পুষ্টি নোটসটি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করবে। উত্তরগুলো বারবার পড়ে ও খাতায় লিখে মুখস্থ করে নাও। পোস্টটি ভালো লাগলে তোমার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবে না। কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকলে বা অন্য কোনো টপিকের নোটস চাইলে নিচে কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবে!