কোয়াসারভেট কাকে বলে? বৈশিষ্ট্য, গঠন ও গুরুত্ব - সম্পূর্ণ নোট | Coacervate in Bengali

জীবনের উৎপত্তি বা অরিজিন অফ লাইফ (Origin of Life) অধ্যায়ে কোয়াসারভেট (Coacervate) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টপিক। ছাত্রছাত্রীদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, প্রথম কোষ কীভাবে তৈরি হলো? বিজ্ঞানী ওপারিন এবং হ্যালডেন-এর তত্ত্বে এই প্রশ্নের উত্তরেই কোয়াসারভেটের ধারণা উঠে আসে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় এবং পয়েন্ট আকারে জানব কোয়াসারভেট কী, এর বৈশিষ্ট্য এবং বিবর্তনে এর গুরুত্ব।


কোয়াসারভেট কাকে বলে? (Definition of Coacervate)

সহজ কথায়, বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওপারিন (A.I. Oparin)-এর মতে, আদিম পৃথিবীতে সমুদ্রের উত্তপ্ত জলে (Hot Dilute Soup) প্রোটিন, শর্করা এবং অন্যান্য জৈব অণুগুলি পরস্পর মিলিত হয়ে যে দ্বি-স্তরীয় আবরণবেষ্টিত কোলয়েড জাতীয় কণা গঠন করেছিল, তাকে কোয়াসারভেট (Coacervate) বলে।

একে জীবনের আদিমতম দশা বা 'প্রোটোবায়োন্ট' (Protobiont)-এর একটি মডেল হিসেবে গণ্য করা হয়।

সংজ্ঞা: "আদিম পৃথিবীতে রাসায়নিক বিবর্তনের ফলে সৃষ্ট, দ্বি-স্তরীয় লিপিড আবরণ দ্বারা আবৃত, বিভাজনে সক্ষম এবং প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও অন্যান্য জৈব অণু দ্বারা গঠিত যে কোলয়েডীয় বিন্দুগুলি প্রাণের আদিরূপ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাদের কোয়াসারভেট বলে।"

কোয়াসারভেট শব্দের উৎপত্তি

ল্যাটিন শব্দ 'Acervus' থেকে 'Coacervate' কথাটি এসেছে, যার অর্থ হলো 'স্তূপ' বা 'গুচ্ছ' (Heap or Pile)। ১৯২৪ সালে বিজ্ঞানী ওপারিন প্রথম এই তত্ত্বটি প্রকাশ করেন।


কোয়াসারভেট গঠন প্রক্রিয়া (Formation Process)

কোয়াসারভেট কীভাবে গঠিত হয়েছিল তা ধাপে ধাপে নিচে বোঝানো হলো (NCERT ও পশ্চিমবঙ্গ বোর্ড সিলেবাস অনুযায়ী):

  1. জৈব অণুর সৃষ্টি: আদিম পৃথিবীতে সমুদ্রের জলে অ্যামাইনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, এবং সরল শর্করা তৈরি হয়েছিল।
  2. ম্যাক্রোমলিকিউল গঠন: এই ছোট অণুগুলি জুড়ে গিয়ে বড় অণু বা পলিমার (যেমন—প্রোটিন, পলিস্যাকারাইড) তৈরি করে।
  3. কোলয়েড দানা সৃষ্টি: এই বৃহৎ অণুগুলি আন্তঃআণবিক বলের (Intermolecular force) প্রভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে সমুদ্রের জল থেকে পৃথক হয়ে ছোট ছোট বিন্দুর মতো গঠন তৈরি করে।
  4. কোয়াসারভেট: এই বিন্দুগুলির চারপাশে জলের অণু বা লিপিড অণুর একটি আস্তরণ তৈরি হয়, যা বাইরের পরিবেশ থেকে এদের আলাদা রাখে।

কোয়াসারভেটের বৈশিষ্ট্য (Characteristics)

পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে এই বৈশিষ্ট্যগুলি অবশ্যই পয়েন্ট করে লিখবে:

  • দ্বি-স্তরীয় আবরণ: কোয়াসারভেটের বাইরে লিপিড বা জলের অণুর একটি দ্বি-স্তরীয় (Double layered) আবরণ থাকে।
  • বিপাকীয় ক্রিয়া (Metabolism): এরা বাইরের পরিবেশ থেকে রসদ বা অণু শোষণ করতে পারত এবং রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে পারত (যা আদিম বিপাক ক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়)।
  • বৃদ্ধি ও বিভাজন: পদার্থ শোষণের ফলে এরা আকারে বৃদ্ধি পেত এবং নির্দিষ্ট আকার ধারণ করার পর ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যেত (যা আদিম কোষ বিভাজনের মতো)।
  • কোলয়েড প্রকৃতি: এগুলি মূলত প্রোটিন এবং পলিস্যাকারাইডের মিশ্রণে তৈরি কোলয়েড কণা।

কোয়াসারভেট কি সজীব ছিল? (Is Coacervate a Living Cell?)

না, কোয়াসারভেটকে পুরোপুরি সজীব কোষ বলা যায় না। কারণ:

  • এদের মধ্যে কোনো নিউক্লিয়াস বা সুগঠিত জেনেটিক বস্তু (DNA/RNA) ছিল না।
  • এদের লিপিড আবরণ খুব একটা স্থায়ী ছিল না।

তবে, কোয়াসারভেটের সাথে নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA বা DNA) যুক্ত হয়ে পরবর্তীকালে প্রথম আদি কোষ বা 'ইওবায়োন্ট' (Eobiont) সৃষ্টি হয়েছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।


মাইক্রোস্ফিয়ার ও কোয়াসারভেটের পার্থক্য (Microsphere vs Coacervate)

অনেক সময় ছাত্রছাত্রীরা কোয়াসারভেট এবং মাইক্রোস্ফিয়ারের মধ্যে গুলিয়ে ফেলে। নিচে এর প্রধান পার্থক্য দেওয়া হলো:

বিষয় কোয়াসারভেট (Coacervate) মাইক্রোস্ফিয়ার (Microsphere)
প্রবক্তা বিজ্ঞানী ওপারিন (Oparin)। বিজ্ঞানী সিডনি ফক্স (Sydney Fox)।
গঠন প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও লিপিড দ্বারা গঠিত। মূলত প্রোটিনয়েড (Proteinoids) দ্বারা গঠিত।
আবরণ দ্বি-স্তরীয় লিপিড আবরণ থাকে। অর্ধভেদ্য দ্বি-স্তরীয় আবরণ থাকে।

বিবর্তনে কোয়াসারভেটের গুরুত্ব

জীবনের উৎপত্তি বা রাসায়নিক বিবর্তন (Chemogeny) থেকে জৈবিক বিবর্তন (Biogeny)-এ পদার্পণের ক্ষেত্রে কোয়াসারভেট একটি সেতুর (Bridge) কাজ করে। এটি প্রমাণ করে যে, জড় পদার্থ থেকেই ধাপে ধাপে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. কোয়াসারভেট মডেলটি কে প্রস্তাব করেন?
উত্তর: বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওপারিন (A.I. Oparin)।

২. প্রোটোবায়োন্ট কী?
উত্তর: আদিম পৃথিবীতে সৃষ্ট নিউক্লিক অ্যাসিড বিহীন কিন্তু বিপাক ক্রিয়ায় সক্ষম যে আদিম কোষীয় গঠন দেখা গিয়েছিল (যেমন- কোয়াসারভেট বা মাইক্রোস্ফিয়ার), তাদের প্রোটোবায়োন্ট বলে।

৩. কোয়াসারভেট কি বিভাজিত হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, কোয়াসারভেট যান্ত্রিকভাবে ভেঙে বা মুকুলোদগমের মতো প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হতে পারত।

৪. 'হট ডাইলুট স্যুপ' (Hot Dilute Soup) কথাটি কে প্রবর্তন করেন?
উত্তর: বিজ্ঞানী হ্যালডেন (J.B.S. Haldane)। তিনি আদিম পৃথিবীর সমুদ্রের উত্তপ্ত জলকে, যাতে প্রচুর পরিমাণে অ্যামাইনো অ্যাসিড ও শর্করা মিশ্রিত ছিল, তাকে 'হট ডাইলুট স্যুপ' বা 'তপ্ত লঘু স্যুপ' বলে অভিহিত করেন। এই স্যুপের মধ্যেই কোয়াসারভেট সৃষ্টি হয়েছিল।

৫. পরীক্ষাগারে ওপারিন কী ব্যবহার করে কোয়াসারভেট তৈরি করেছিলেন?
উত্তর: বিজ্ঞানী ওপারিন পরীক্ষাগারে গাম অ্যারাবিক (Gum Arabic) এবং জিলেটিন (Gelatin)-এর জলীয় দ্রবণ মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে কোয়াসারভেট মডেল তৈরি করে দেখান।

৬. কেমোজেনি (Chemogeny) বা রাসায়নিক বিবর্তন কী?
উত্তর: যে প্রক্রিয়ায় আদিম পৃথিবীতে সরল অজৈব অণু থেকে ধাপে ধাপে জটিল জৈব অণু এবং শেষে কোয়াসারভেটের মতো জৈব কণা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে কেমোজেনি বা জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বলে।

৭. ইওবায়োন্ট (Eobiont) কী?
উত্তর: কোয়াসারভেট বা মাইক্রোস্ফিয়ারের সঙ্গে যখন নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA/DNA) যুক্ত হয়ে আত্মপ্রতিলিপি গঠনে সক্ষম আদিমতম কোষীয় গঠন তৈরি করল, তখন তাকে ইওবায়োন্ট বা প্রোটোসেল বলা হয়। এটিই হলো প্রথম সত্যিকারের আদি কোষ।

৮. কোয়াসারভেট এবং বর্তমান কোষের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: বর্তমান কোষে সুনির্দিষ্ট কোষপর্দা এবং বংশগতি বস্তু (DNA) থাকে যা প্রজননে সাহায্য করে। কিন্তু কোয়াসারভেটে কোনো নিউক্লিক অ্যাসিড ছিল না এবং এর আবরণটিও আজকের কোষপর্দার মতো এত উন্নত ও স্থায়ী ছিল না।


আশা করি এই নোটটি তোমাদের কোয়াসারভেট সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিতে পেরেছে। এটি জীবন বিজ্ঞান পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করো।