পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ - নবম শ্রেণি - জীবনবিজ্ঞান: সংবহন (Circulation) সম্পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, Bigyanbook-এ তোমাদের আরও একবার স্বাগত। আজকের এই পোস্টে আমরা পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণির জীবনবিজ্ঞান সিলেবাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ 'সংবহন (Circulation)' থেকে বাছাই করা সমস্ত ধরনের প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। উদ্ভিদদেহে জল ও খাদ্যের সংবহন থেকে শুরু করে মানুষের রক্ত ও হৃৎপিণ্ড—সব কিছুই এই প্রিমিয়াম নোটসে খুব সহজ ভাষায় গুছিয়ে লেখা হয়েছে। চলো শুরু করা যাক!
বিভাগ ক: অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)
১. মানুষের রক্ত সংবহনতন্ত্র কে প্রথম আবিষ্কার করেন?
উত্তর: বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্ভে (William Harvey) ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মানুষের রক্ত সংবহনতন্ত্র আবিষ্কার করেন।
২. উদ্ভিদদেহে জল ও খনিজ লবণ কোন কলার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়?
উত্তর: উদ্ভিদদেহে জল ও খনিজ লবণ জাইলেম (Xylem) কলার মাধ্যমে ঊর্ধ্বমুখে পরিবাহিত হয়।
৩. উদ্ভিদদেহে উৎপন্ন তরল খাদ্য কোন কলার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়?
উত্তর: পাতায় উৎপন্ন তরল খাদ্য ফ্লোয়েম (Phloem) কলার মাধ্যমে উদ্ভিদদেহের বিভিন্ন অংশে পরিবাহিত হয়।
৪. রক্তের তরল ধাত্র বা উপাদানটিকে কী বলা হয়?
উত্তর: রক্তের তরল উপাদানটিকে রক্তরস বা প্লাজমা (Plasma) বলা হয়, যা রক্তের প্রায় ৫৫%।
৫. মানুষের লোহিত রক্তকণিকার (RBC) আয়ু কত দিন?
উত্তর: মানুষের লোহিত রক্তকণিকার গড় আয়ু ১২০ দিন।
৬. মানুষের হৃৎপিণ্ডের কোন প্রকোষ্ঠের প্রাচীর সবচেয়ে বেশি পুরু?
উত্তর: মানুষের হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয়ের (Left Ventricle) প্রাচীর সবচেয়ে বেশি পুরু হয়।
৭. কোন রক্ত গ্রুপকে 'সার্বজনীন দাতা' (Universal Donor) বলা হয়?
উত্তর: 'O' (ও) গ্রুপের রক্তকে সার্বজনীন দাতা বলা হয়, কারণ এই গ্রুপের রক্ত যে কোনো গ্রুপের মানুষকে দেওয়া যায় (বিশেষত O Negative)।
৮. কোন রক্ত গ্রুপকে 'সার্বজনীন গ্রহীতা' (Universal Recipient) বলা হয়?
উত্তর: 'AB' (এবি) গ্রুপের রক্তকে সার্বজনীন গ্রহীতা বলা হয়, কারণ এরা সব গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করতে পারে।
৯. মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ (Blood Pressure) কত?
উত্তর: মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ হলো ১২০/৮০ mmHg (সিস্টোলিক চাপ ১২০ এবং ডায়াস্টোলিক চাপ ৮০)।
১০. রক্তচাপ মাপার যন্ত্রের নাম কী?
উত্তর: রক্তচাপ মাপার যন্ত্রের নাম স্ফিগমোম্যানোমিটার (Sphygmomanometer)।
১১. হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক পেসমেকার (Natural Pacemaker) কোনটি?
উত্তর: ডান অলিন্দে অবস্থিত SA Node (সায়নো-অ্যাট্রিয়াল নোড)-কে হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক পেসমেকার বলা হয়।
১২. বাষ্পমোচন বা প্রস্বেদন মাপার যন্ত্রের নাম কী?
উত্তর: বাষ্পমোচনের হার মাপার যন্ত্রের নাম গ্যানং-এর পোটোমিটার (Ganong's Potometer)।
বিভাগ খ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ২)
১. মুক্ত সংবহন ও বদ্ধ সংবহন কাকে বলে?
উত্তর:
- মুক্ত সংবহন: যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত কেবল রক্তবাহের (শিরা, ধমনী) মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেহগহ্বরে (হিমোসিল) মুক্ত হয়, তাকে মুক্ত সংবহন বলে। উদাহরণ: আরশোলা, চিংড়ি।
- বদ্ধ সংবহন: যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত সর্বদা রক্তবাহ ও হৃৎপিণ্ডের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, কখনও দেহগহ্বরে মুক্ত হয় না, তাকে বদ্ধ সংবহন বলে। উদাহরণ: মানুষ, কেঁচো।
২. বাষ্পমোচন টান (Transpiration Pull) কী?
উত্তর: পাতার মেসোফিল কলায় বাষ্পমোচনের ফলে জলের ঘাটতি দেখা দিলে জাইলেম বাহিকায় একটি ঊর্ধ্বমুখী চোষক বল বা টানের সৃষ্টি হয়, যা মূল থেকে জলকে পাতার দিকে টেনে তোলে। একেই বাষ্পমোচন টান বা Transpiration Pull বলে।
৩. ধমনী ও শিরার মধ্যে দুটি মূল পার্থক্য লেখো।
উত্তর:
- ধমনী সাধারণত বিশুদ্ধ বা অক্সিজেন যুক্ত (O2) রক্ত বহন করে (ব্যতিক্রম: ফুসফুসীয় ধমনী)। অন্যদিকে শিরা দূষিত বা কার্বন ডাই-অক্সাইড যুক্ত (CO2) রক্ত বহন করে (ব্যতিক্রম: ফুসফুসীয় শিরা)।
- ধমনীর প্রাচীর পুরু ও গহ্বর সরু হয়, আর শিরার প্রাচীর পাতলা ও গহ্বর চওড়া হয়।
৪. Rh ফ্যাক্টর (Rh Factor) কী?
উত্তর: রেসাস (Rhesus) নামক বানরের রক্তে অবস্থিত এক বিশেষ ধরনের অ্যান্টিজেন মানুষের রক্তেও (লোহিত রক্তকণিকায়) অনেকের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। একেই Rh ফ্যাক্টর বা রেসাস ফ্যাক্টর বলে। যাদের রক্তে এটি থাকে তাদের Rh+ (পজিটিভ) এবং যাদের থাকে না তাদের Rh- (নেগেটিভ) রক্ত বলা হয়।
৫. সিস্টোল ও ডায়াস্টোল বলতে কী বোঝো?
উত্তর: হৃৎপিণ্ডের পেশির সংকোচনকে সিস্টোল (Systole) বলা হয়, যার ফলে রক্ত হৃৎপিণ্ড থেকে রক্তবাহে প্রবেশ করে। আর হৃৎপিণ্ডের পেশির প্রসারণ বা শিথিল অবস্থাকে ডায়াস্টোল (Diastole) বলা হয়, যার ফলে রক্ত বাইরে থেকে হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করে।
বিভাগ গ: রচনাধর্মী / দীর্ঘ প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৩ / ৫)
১. রসের উৎস্রোত (Ascent of Sap) কাকে বলে? ডিক্সন ও জলির বাষ্পমোচন টান ও সমসংযোগ বল মতবাদটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর:
রসের উৎস্রোত: যে প্রক্রিয়ায় মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ (রস) জাইলেম বাহিকার মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীতে ঊর্ধ্বমুখে বাহিত হয়ে পাতায় পৌঁছায়, তাকে রসের উৎস্রোত বলে।
ডিক্সন ও জলির মতবাদ: বিজ্ঞানী ডিক্সন এবং জলি (Dixon and Joly) রসের উৎস্রোত ব্যাখ্যার জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতবাদটি দেন। এর দুটি প্রধান দিক হলো:
- জলের সমসংযোগ বল (Cohesive force of water): জলের অণুগুলি নিজেদের মধ্যে একপ্রকার আকর্ষণের মাধ্যমে যুক্ত থাকে (সমসংযোগ বল) এবং জাইলেম বাহিকার প্রাচীরের সাথেও লেগে থাকে (অসমসংযোগ বল)। এর ফলে মূল থেকে পাতা পর্যন্ত একটি অবিচ্ছিন্ন জলস্তম্ভ তৈরি হয়, যা সহজে ভাঙে না।
- বাষ্পমোচন টান (Transpiration Pull): পাতা থেকে বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ায় জল বেরিয়ে গেলে পাতার কোষে জলের ঘাটতি তৈরি হয়। এই ঘাটতি পূরণের জন্য জাইলেম নালিকায় একটি তীব্র চোষক টান বা বাষ্পমোচন টানের সৃষ্টি হয়। এই টানের প্রভাবেই অবিচ্ছিন্ন জলস্তম্ভটি সুউচ্চ বৃক্ষের মগডাল পর্যন্ত উঠে যায়।
২. বাষ্পমোচনকে ‘প্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক পদ্ধতি’ (Necessary Evil) বলা হয় কেন?
উত্তর: বিজ্ঞানী কার্টিস (Curtis) বাষ্পমোচনকে 'Necessary Evil' বা 'প্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক পদ্ধতি' বলেছেন। কারণ বাষ্পমোচনের যেমন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তেমনি অপকারিতাও রয়েছে।
প্রয়োজনীয়তা:
- বাষ্পমোচন টানের ফলেই উদ্ভিদদেহে রসের উৎস্রোত ঘটে এবং জল পাতায় পৌঁছায়।
- এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ তার দেহের অতিরিক্ত জল বের করে দেয়।
- জল বাষ্পীভূত হওয়ার সময় লীনতাপ গ্রহণ করায় উদ্ভিদদেহ শীতল থাকে।
- গ্রীষ্মকালে মাটিতে জলের অভাব থাকলেও বাষ্পমোচন চলতে থাকে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জল বেরিয়ে গেলে উদ্ভিদ নেতিয়ে পড়ে, যাকে উইলটিং (Wilting) বলে। চরম অবস্থায় উদ্ভিদের মৃত্যুও হতে পারে।
৩. মানুষের রক্তের উপাদানগুলি কী কী? বিভিন্ন রক্তকণিকার কাজ আলোচনা করো।
উত্তর: রক্ত প্রধানত দুটি উপাদান নিয়ে গঠিত: ১. রক্তরস বা প্লাজমা (৫৫%) এবং ২. রক্তকণিকা (৪৫%)।
রক্তকণিকা আবার তিন প্রকারের হয়। এদের কাজ নিচে দেওয়া হলো:
- লোহিত রক্তকণিকা (RBC / Erythrocyte): এর মধ্যে থাকা হিমোগ্লোবিন ফুসফুস থেকে অক্সিজেন (O2) শোষণ করে দেহের প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেয় এবং কোষ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) ফুসফুসে ফিরিয়ে আনে। রক্তের অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য বজায় রাখে।
- শ্বেত রক্তকণিকা (WBC / Leucocyte): ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় রোগজীবাণু ধ্বংস করে। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা (Immunity) গড়ে তোলে। যেমন- লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
- অনুচক্রিকা (Platelets / Thrombocyte): দেহের কোনো অংশ কেটে গেলে সেখানে থ্রম্বোপ্লাস্টিন নিঃসরণ করে রক্ত জমাট বাঁধতে বা রক্ত তঞ্চনে সাহায্য করে, ফলে রক্তপাত বন্ধ হয়।
৪. রক্ত তঞ্চন (Blood Clotting) পদ্ধতিটি সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
উত্তর: দেহের কোনো অংশ কেটে গেলে যে প্রক্রিয়ায় রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপাত বন্ধ হয়, তাকে রক্ত তঞ্চন বলে। এটি প্রধানত ৩টি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- থ্রম্বোপ্লাস্টিন গঠন: ক্ষতস্থানের কলাকোষ এবং ভেঙে যাওয়া অনুচক্রিকা থেকে থ্রম্বোপ্লাস্টিন (Thromboplastin) নিঃসৃত হয়।
- থ্রম্বিন উৎপাদন: থ্রম্বোপ্লাস্টিন রক্তে থাকা ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca++)-এর সাহায্যে রক্তের নিষ্ক্রিয় প্রোথ্রম্বিন-কে সক্রিয় থ্রম্বিনে (Thrombin) পরিণত করে।
- ফাইব্রিন জালক গঠন: সক্রিয় থ্রম্বিন রক্তরসের দ্রবণীয় ফাইব্রিনোজেন নামক প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন (Fibrin) তন্তু গঠন করে। এই তন্তুগুলি জালের মতো আটকে গিয়ে ক্ষতস্থান বন্ধ করে দেয় এবং রক্ত জমাট বেঁধে যায়।
৫. মানুষের হৃৎপিণ্ডের গঠন এবং দ্বি-সংবহন (Double Circulation) পদ্ধতিটি সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর:
হৃৎপিণ্ডের গঠন: মানুষের হৃৎপিণ্ড বক্ষগহ্বরে দুটি ফুসফুসের মাঝে অবস্থিত। এটি চার প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট। উপরের দুটি প্রকোষ্ঠ হলো ডান অলিন্দ ও বাম অলিন্দ এবং নিচের দুটি হলো ডান নিলয় ও বাম নিলয়। ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝে ত্রিপত্রক কপাটিকা (Tricuspid valve) এবং বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের মাঝে দ্বিপত্রক বা মিট্রাল কপাটিকা (Bicuspid valve) থাকে।
দ্বি-সংবহন পদ্ধতি: মানুষের রক্ত সংবহনকে দ্বি-সংবহন বলা হয় কারণ রক্ত সম্পূর্ণ একবার হৃৎপিণ্ডে আবর্তিত হওয়ার সময় দু'বার হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে যায়।
- ফুসফুসীয় সংবহন: সমগ্র দেহ থেকে দূষিত রক্ত (CO2 যুক্ত) ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মহাশিরা দিয়ে ডান অলিন্দে আসে। সেখান থেকে ডান নিলয় হয়ে ফুসফুসীয় ধমনীর মাধ্যমে ফুসফুসে যায় শুদ্ধ হওয়ার জন্য।
- সিস্টেমিক সংবহন: ফুসফুসে রক্ত অক্সিজেনেটেড (O2 যুক্ত) হওয়ার পর ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে বাম অলিন্দে প্রবেশ করে। এরপর বাম নিলয়ে যায় এবং সেখান থেকে মহাধমনী (Aorta) দিয়ে সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে।
আশা করি Bigyanbook-এর এই প্রিমিয়াম নোটসটি তোমাদের 'সংবহন' অধ্যায়ের প্রস্তুতিতে দারুণভাবে সাহায্য করবে। উত্তরগুলো খাতায় লিখে মুখস্থ করে নিলে পরীক্ষায় নিশ্চিন্তে ভালো রেজাল্ট করতে পারবে। পোস্টটি উপকারে আসলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবে না। কোনো প্রশ্ন থাকলে বা অন্য কোনো টপিকের নোটস লাগলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারো।
